অনুসন্ধান

নৈতিকতা ও বাস্তববোধশক্তি অনেক ব্যক্তিত্বের দ্বারা কৃতকর্মের সংজ্ঞাগুলোকে পাল্টে দেয়, দৃষ্টিকোণ অনেকিছুই বুঝতে শেখায় কিন্তু মানতে শেখায় না। অন্যকে দোষারোপ করে নিজেকে ভুল বুঝিয়ে বা কখনো নিজে ভুল বুঝে দিন কেটে যায় ঠিকই কিন্তু আদৌ কি সম্পর্ক, মানুষ এই শব্দগুলো মানসিক অবসাদ বা নিজেকে খুঁজে বের করার মাধ্যম ছাড়া অন্য কিছুও কি হতে পারে? বেশ গম্ভীর প্রশ্ন। সামাজিক নিয়মবিধি পালন করা উচিত, সম্পর্কে জড়ানো উচিত, সংসার করা উচিত, ছোটবেলা থেকে কতগুলো করা উচিত মিলে একটা অদৃশ্য কারাগারের রচনা করতে থাকে, এটা একটা পদ্ধতি যার শেষ খুঁজে পাওয়া যায় না যতক্ষণ না পর্যন্ত নিজের লাগাম নিজের হাতে তুলে নিয়ে ওঠাটা সম্ভব হয়ে উঠছে। গৃহবন্দী, বাধ্য, স্বাভাবিক আহার মানে ওই অন্যের চোখে যা পছন্দের সেটাকেই স্বাভাবিক মেনে নেওয়া, অন্যের আবেগে খুশি প্রকাশ করা কিন্তু নিজের খুশির কারণগুলোকে সমানে আড়াল করতে থাকা, এরকমই গৃহপালিত পশুদের মতো আচরণবিশিষ্ট মানুষগুলো সবার প্রিয় ও পছন্দের। অবাধ্য, বন্য, নিজের পছন্দের গুরুত্ব বোঝা মানুষগুলো পছন্দতালিকাতে স্থান পায় সবার শেষে, কিন্তু বাধ্য মানুষ সবার পছন্দ। বোঝা দায় পোষ্য মানুষদের কাছ থেকে বা তাদের কথায় পছন্দের মানুষদের কাছ থেকে ঠিক কি চাওয়া হয়? বাধ্যতা নাকি শূন্যস্থান ভরাটের অনুরোধ পূরণের দাবি? নিজেকে নিজে খুঁজতে গিয়ে এরকম কিছু উদ্বাস্তু প্রশ্ন ভিড় করে, জানতে ইচ্ছে হয়, নিজেকে বড়ো প্রমান ও নিজের নিজস্বত্বতা জাহির একমাত্র নিজের থেকে ছোট, কম ক্ষমতাযুক্ত বা নিজের কাছে হার মেনে যাওয়া মানুষদের কাছেই হয় কেন? আবেগী সমীকরণের সাথে মস্তিষ্কের ভারসাম্য যুক্ত সমীকরণ বললে হৃদয়হীন মানুষের পরিচয় তাহলে হয় কেন? কেন মানুষ নিজের পেশাগত জীবনে আবেগকে গুরুত্ব দেয় না আর ব্যক্তিগত জীবনে তার ভান করে আরো কয়েকটা মানুষকে আবেগী সমীকরণ গুলোর কথা বলে, দেখায়, শোনায়, উপন্যাসের প্রিয় চরিত্রটির মতো নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার তীব্র চেষ্টার পাশাপাশি দু চারটে অন্য মানুষকে দোষারোপ করে দায় মুক্ত হয়ে ঘুমোতে চলে যায়? অন্য মানুষকে, পরিস্থিতিকে, পারিপার্শিককে দোষারোপ করলেই কি মানসিক শান্তির লাভ ঘটে? ঘটে না নিশ্চই না হলে বার বার তা করতে হতো না হয়তো। দোষারোপ করে সেটা যাকেই হোক মানসিক শান্তি পাওয়া আর বার বার মাদকদ্রব্যের সেবন করার সাথে বেশ মিল চোখে পড়ে। দুটোরই প্রভাব খুব বেশিক্ষন থাকে না। মাদকদ্রব্য সেবন করে ক্ষনিকের আনন্দ ও শান্তি অনেকটা রূপকের গল্পের মতো যেটা দোষারোপ করার অভ্যেসটিও প্রদান করে কিন্তু দুটোরই অভ্যেস জীবনে একবার প্রবেশ করলে সহজে ছেড়ে যায় না। একটা শারীরিক ও আরেকটি আবেগী মৃত্যুর দিকে ক্রমাগতভাবে মানুষকে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকে। মানুষ সবই বোঝে কি বোঝে না ঠিক জানা না থাকলেও ক্ষনিকের আনন্দ আর মরুভূমির মরীচিকার খুব সহজেই দৃষ্টি গোচর হওয়ার নজির রেখে যায় প্রত্যেকবার। ক্ষনিকের আনন্দ যদি কোনো ব্যক্তিত্বের মাপকাঠি কমিয়ে অর্জিত হয়, সেই আবেগী স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদি অল্পবিস্তর অস্বস্তির ছাপ রাখে। এসব জেনেও মানুষ মাদকাসক্ত, ক্ষনিকের আনন্দে ব্যস্ত, অন্যের কম উচ্চতাকে নিজের বেশি উচ্চ্যতার কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে করতে ক্লান্ত। এক অদ্ভুত নেশা, যার নেশাতে সবাই একটু কম বা একটু বেশি নেশাগ্রস্ত। নৈতিকতা ও বাস্তবিকতার অনুভূতি নেশাগ্রস্ততার অনুভূতি করায়, আনে বিরক্তি, অস্বস্তি ও নিজের প্রতি ঘৃণা যাকে জন্মগ্রহণের সাথে সাথেই মেরে ফেলা হয় পরিবেশ, পরিস্থিতি, সম্পর্ক ও  মানুষকে দোষারোপ করে। একটা নেশা কাটাতে আরেকটা নেশা আসে কিন্তু নেশা থেকে মুক্তি আর ঘটে না। সমালোচনা ও দোষারোপ করাকে অনেকে আবার এক ভেবে ফেলে। যখন দুটো আলাদা মানুষ সমান হয় না তখন সমালোচনা করার সুবিদার্থে ছোট ছোট ক্ষেত্র ভেঙে সমালোচনা করা হয়ে থাকে। কিন্তু দোষারোপ করে, ও খারাপ আমি ভালো প্রমান করে, যদিও সেই ভালো খারাপগুলো সবই সমাজ দ্বারা সংজ্ঞায়িত, একদমই নিজের নয়, ক্ষনিকের মানসিক শান্তি পাওয়া যায় ওই নেশা করার মতো। তারপর? চক্রের মতো গ্রাসিতো হতে থাকা মানুষটা বোধগম্যতার ঘাটতিকে কারণ হিসেবে দেখায়। কারণ প্রদর্শন কৃত কর্মের সপক্ষে, এর প্রয়োজনীয়তা কি যদি না কেউ জানতেই চায়? নিজের মধ্যে ঘটে চলা দ্বন্দ্বে জয়ী হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করার অসীম প্রবণতা নিজের ভালোলাগা কাজটির মাধ্যমে প্রকাশিত কেন হয় না? কেন আসে না চেষ্টা? কেন নিজেকে প্রতিটা পদে বিকলাঙ্গের মতো ভেবে অন্যকে সুস্থ মানুষের আখ্যা দেওয়া হয়? আমার দ্বারা হবে না বলে বেরিয়ে আশা মানসিক ভাবে ক্লান্ত মানুষটা হার মানে কার কাছে? নিজের কাছে? নাকি নিজের কাছে? যারা দোশারোপিত হয়, যারা সমালোচিত হয় তাদের ওপর প্রভাব প্রথমত খুব একটা পড়ে না আর যদি পড়ে তাও নিজের আবেগ আর সময়ের মূল্যের কাছে প্রভাবের প্রভাব বিস্তার করাটা খুবই গৌণ পর্যায় দাঁড়িয়ে থাকে। বরং জীবনসংগ্রামে নিজের নিজস্বত্বতা তলিয়ে যেতে শুরু করে, নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলতে শুরু করে মানুষ। বিভিন্ন ঘটনা, বিভিন্ন কারণ কখনো সামাজিক প্রেক্ষাপটে গ্রহণযোগ্যতা, কখনো পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হওয়া, প্রিয় না হয়ে উঠতে পারা বা চাওয়া পাওয়াতে রূপান্তরিত না হওয়া, এতে ভালো দিক যেমন আছে সেরকম কর্মকেন্দ্রিক, যান্ত্রিক কর্মজীবনে ভারসাম্যহীনতার ছোঁয়া নিয়ে আসাটাও রয়েছে  যাদেরকে পাগলের আখ্যা সমাজ বা ডাক্তার দেয় না কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা ক্রমাগতভাবে নিজের পুরোনো নিজেকে খুঁজে চলে অনবরত, যেন এক অন্তহীন অনুসন্ধান। সমাজের প্রেক্ষাপটে আবেগী সমীকরণগুলো অনেকের কাছে অবাস্তবিক ঠিকই কিন্তু নিজের মস্তিষ্কের বোধগম্যতা ও বিচক্ষণশীলতার সমীকরণ সমানে কতগুলো রণক্ষেত্র অতিক্রম করে চলে, কুরুক্ষেত্রের থেকেও ভয়াবহ যুদ্ধ লড়ে শুধু দাগ, মৃত্যু, শোক কোনোকিছুকেই মলাটে আঁচড় কাটতে দেওয়া হয় না, অন্তঃসত্বার অস্বাভাবিকতা বাহ্যিক স্বাভাবিকতার রচনা করে চলে, হয়তো তারই মাঝে নিজের নিজেকে একদল মানুষ সমানে খুঁজে চলে আর একদল দোষারোপ করে নিজেকে ভুলে যাওয়ার ভান করে। 

Leave a Reply